সোশ্যাল মিডিয়া; মায়াজালের কালো হাত থামাবে কে?

 ২০১৯-০৯-০৬  ০৮:১২ পিএম
 অভিমত

সোশ্যাল মিডিয়া; মায়াজালের কালো  হাত থামাবে কে?

মাহবুবুর রহমান:ফেইসবুক, একটি ধোঁয়াশার জায়গা। অর্ন্তজালের ভেতরের এক অদ্ভুত জাল। মায়াজাল বলা যায়। এতে যারা একবার আসক্ত হয়ে যায় তারা মাদকাসক্ত এর চেয়ে ভয়ানক আচরণ শুরু করে। দিনে ঘুমানো, রাত জাগা, লুকিয়ে লুকিয়ে ফেইসবুক এর টাইমলাইনে ঘুরা, আগন্তুুকের সাথে কথা বলা, অপরিচিত কে ব্যক্তিগত তথ্য প্রদান করা, আগšু‘ক কে আপন করে নেয়া আর নতুন সম্পর্ক এর ভীড়ে পুরাতন সম্পর্কতে ফাটল ধরানো ইত্যাদি।

এসবি ফেইসবুকের কল্যাণে এখন নিত্যদিনের ব্যাপার স্যাপার। প্রেমের টানে কে ফেইসবুকে পরিচিত হয়ে দেশ বিদেশ থেকে এসে ঘাট বাঁধলো তা পত্রিকার শিরোনাম হয় টিকেই, কিন্তু প্রতিদিন এই ফেইসবুকের কল্যাণে গড়ে কয়টি ডিভোর্স এর ঘটনা ঘটছে তার খোঁজ কিন্তু আমরা রাখি না। তথ্য প্রযুক্তির এই আবিষ্কার আমাদের কে মশার মত আকড়ে ধরেছে। এ এক অদ্ভুত মায়াজাল। ফেইসবুক ব্যবহার করে অনেক ব্যবসায়ি লাভবান হচ্ছেন। দেশের অনেক নারীরা পেয়েছেন আত্মনির্ভরশীল হবার একটি যথাযোগ্য জায়গা। ফেইসবুক লাইভ, কমেন্টস, পোস্ট, শেয়ারিং করে ভালোই চলে যাচ্ছে তাদের ছোট বড় অফিসহীন ব্যবসাপাতি। অনেকে এভাবে ব্যবসা করে অফিস দোকানও করে বসেছে। যা আমাদের দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু এর ভীড়েই কিছু মানুষ জোঁকের মতন জেঁকে বসেছে। অনলাইনে ভূয়া পণ্য বিক্রি, জালিয়াতি ইত্যাদি করে এই সুন্দর ব্যবসায়ের জায়গ ভরসার জায়গাটা নষ্ট করতে উঠে পড়ে লেগেছে। সস্তায় চটকদার পণ্য দেবার নাম করে এরা ক্রেতা ঠকিয়ে যাচ্ছে অবিরাম। ঠকাচ্ছে হাজার জন ধরা পড়ছে গুটিকয়েক।এর মধ্যে আবার কিছু রয়েছে যারা মেয়েদের ব্যবসায়িক ফেইসবুক লাইভ গুলোতে গিয়ে বাজে কমেন্টস করে, গালাগালি করে, ব্যক্তিগত আক্রোশ প্রচার করে। কেউ কেউ একে অন্যের আইডি ডিজেবল করে দেয় রিপোর্ট করে। চলে পাল্টাপাল্টি আক্রমণ। সমাধান হয় না কিছুতেই।

এবার যে শ্রেণির কথা বলবো এদের কে কি বলা যায় তার ভাষা আমার জানা নেই। এরা লাইক, কমেন্টস আর শেয়ার ভিক্ষা করে করে নেয়! রোস্ট বা এক্সপোজ করা হবে এই শিরোনামে এরা পোস্ট দিয়ে দিয়ে কমেন্ট আদায় করে সাধারণ ফেইসবুক ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে।শুধুমাত্র কিছু ভিউ থেকে আয়ের জন্য এরা ইউটিউব এবং ফেইসবুকে রোস্ট বা এক্সপোজ নামক ভিডিও অনলাইনে ছড়ায়। এদের কিছু চেইন রয়েছে। চেইন এর মাথা কোনো পোস্ট করলে চেইন এর বাকি অংশরা ও তার মতন একই কাজে লিপ্ত হয়। শুরু হয় ভিউ সাবস্ক্রাইবার এর উন্মুক্ত খেলা। অনেকে আবার অনলাইনে ফেইসবুকে তা বিজ্ঞাপন দিয়ে শেয়ার করে। সোশ্যাল মিডিয়া ট্রায়ালটা কে আমরা এখন এসব করে এমন একটা জায়গায় নিয়ে গিয়েছি যে, লজ্জায় মাথা কাটা যায় এখন অনলাইনে ঢুকলেই।

এই রোস্টার বা এক্সপোজাররা যা করে ফেইম বা নাম এর জন্য। এর ভিক্টিম এবং সন্ধিগ্ধ ব্যক্তির ছবি বা ভিডিও মন ইচ্ছা মতন নিজ মাপকাঠিতে তদন্ত করে অনলাইনে ছেড়ে দেয় আর এক শ্রেণির নতুন দর্শকরা তা না জেনে বুঝেই লুফে নিয়ে সেই ভিক্টিম বা সন্ধিগ্ধ ব্যক্তির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আইনের ভাষ্যমতে, চূড়ান্ত প্রতিবেদন আর চূড়ান্ত রায়ের আগে কাউকে আসামী বলা যায় না কিন্তু এই ফেইসবুক আর ইউটিউবের ইনভেস্টিগেটর অফিসারেরা ঘটনার ৩-৭ দিনের মধ্যেই তাদের তদন্ত রিপোর্ট প্রদান শুরুর পাশাপাশি চারিত্রিক সনদপত্র ও প্রদান করেন যা কিনা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ বটে। এমন কি হুমড়ি পড়ার পর মুহুর্তেই একদল হ্যাকার সেই ভিক্টিম বা সন্ধিগ্ধ ব্যক্তির ফেইসবুক আইডি, গ্রুপ, পেজ হ্যাক করে ফেলে যা খুবই অদ্ভুত রে!  বস্তুত আমাদের দেশে যে সকল সাধারণ ফেইসবুক আর ইউটিউব ইউজার আছেন তারা দ্বিধাতে পড়ে যান এতে। যার কারণেই আসলে সহসাই গুজবের মতন বড় ব্যাপার গুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এর অন্ধভক্ত বানাচ্ছে মানুষকে। ভ্রান্ত আর মিথ্যায় বানোয়াট গল্পের পশরা সাজিয়ে মানুষের বিশ্বাসকে পুজি করে নিজের ব্যবসা চালাচ্ছে আর ব্যক্তিগত আক্রোশকে জাতীয় সমস্যা এবং আক্রোশে রূপান্তর করছে।

অনলাইন এর উপর এই কালো থাবা আমাদের দেশের অনলাইনের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। কলকাঠি নাড়া এই কালো হাত গুলো থামানো না গেলে সামনে গিয়ে ভয়ানক বিপর্যয় হতে পারে। কিশোর গ্যাং এর পাশাপাশি এই ফেইসবুক ইউটিউব গ্যাংদের ব্যাপারেও কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এসেছে। নিরাপদ অনলাইন আমাদের সকলের কাম্য। কিন্তু যারা এই অনলাইন টিকে অনিরাপদ করে তুলছে তাদের থামানোর রাস্তাটা কে দেখাবে? সেটাই বিবেচ্য বিষয় নয় কি?

লেখক: মাহবুবুর রহমান... সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম এনালিস্ট, সিরিয়াস ক্রাইম এনালিস্ট, গ্রাফিক্স ডিজাইনার ও হিউম্যান রাইটস এক্টিভিটিস ঢাকা।