আরিফ সবুজ ( নোয়াখালী প্রতিনিধি) :
মনিকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে সবে এক বছর হলো।কুয়েত-মৈত্রী হলে থাকে। এখন রুমে কেউ নেই। রুমের সবাই ক্লাশে চলে গেছে।নি:সঙ্গতায় হতাশা নাকি মায়া হয়ে ধরা দেয়।মনিকার মনের বিষন্নতা শুন্য রুমে খিলখিল করে হেসে উঠলো। দরজার হুকটা লাগিয়ে ফ্যানের সাথে ওড়না বেধে ফেললো মনিকা।সিদ্ধান্ত ফাইনাল,সে অাত্বহত্যা করবে।এ নিষ্ফল অার কলংকিত মুখ কাউকে দেখাবেনা।

মনটা ভাল নেই বলে সকালে ক্লাস থাকলেও মনিকা ক্লাসে যায়নি।ওয়াশরুম থেকে এসে ঢকঢক করে তিন গ্লাস পানি খেয়েছে।সারা রাত কেঁদেছে।স্মৃতির বিড়ম্বনায় একটুও ঘুমাতে পারেনি।সকালে টয়লেটে অনেক্ষণ থাকলেও কাজ হয়নি।মেজাজ খিটখিট হয়ে অাছে।মনে হচ্ছে পৃথীবিতে কেউ তার নয়,সে কারো নয়।
তবে সে বাঁচবে কেন?মনিকার মনের প্রশ্ন দীপ্তি জানালা দিয়ে খেয়াল করলো মনিকা ফ্যানের সাথে বাঁধা ওড়নার সাথে গলা পেঁচানোর চেষ্টা করছে।দীপ্তি স্বজোরে চিৎকার দিয়ে সবাইকে জড়ো করে ফেলল।হলের মামাদের চেষ্টায় খুব দ্রুত দরজা ভেঙ্গে দীপ্তি মনিকাকে জড়িয়ে ধরে টেনে নিচে নামালো।একজন মনিকা বেঁচে গেল।মনিকার চোখ বেয়ে ঘৃণার প্লাবন বইছে।

সবাইকে রুম থেকে বের হতে বলে দীপ্তি মনিকাকে শান্তনা দিতে লাগলো।
-বিকেলে দীপ্তিকে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো মনিকা।অামি কি নিয়ে বাঁচবো,দীপ্তি?মনিকা জিজ্ঞস করে। -কেন,তোর কি নেই যে বাঁচার অবলম্বন খুঁজে পাচ্ছিসনা?দীপ্তি তাচ্ছিল্য ভাব নিয়ে জিজ্ঞেস করলো।

-বিপ্লব অামাকে বিয়ের কথা বলে অনেকবার শারীরিক সম্পর্ক করেছে।ভালবাসার টানে অামার দেহ-প্রাণ সব ওর কাছে সপে দিয়েছি।কিন্তু এখন নাকি………বলতে বলতে মনিকার গলা ধরে এলো।
-দীপ্তি বোরকা গায়ে দিতে দিতে বলল “বিয়ে ছাড়া যৌন সঙ্গম করা পাপ,এটা তো ধর্মীয় চেতনা বা ধর্মীয় রুলস।কিন্তু ধর্মের কোথায় পেয়েছিস এরকম পাপ করলে সব শেষ হয়ে যাবে এবং সুইসাইড করলে পাপের প্রায়শ্চিত্য হবে?”

-কিন্তু,এ দেহ অার কার কাছে সমর্পণ করবো? তাকে কি ঠকানো হবেনা?আল্লাহ কি আমাকে ক্ষমা করবে? মনিকা বিষাদের সুরে জিজ্ঞেস করে।
-তুই যাকে বিয়ে করবি তাকে কি শুধু শারীরিক সম্পর্ক করার জন্যই বিয়ে করবি?অার ঐ একটা অঙ্গ ছাড়া কি তোর এত সুন্দর ব্যবহার,মেধা অার ভাল মনটার কোন মুল্য নেই?তোর সৃষ্টি কি শুধু এ একটা মাত্র উদ্দেশ্যেই সাধন করার জন্য হয়েছে ?একটা প্রতারক মানুষের জন্য তুই হেরে যাবি? দীপ্তি পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে।

-মনিকা ছোট বাচ্চার মত দীপ্তির দিকে উত্তরের অপেক্ষায় চেয়ে থাকে।
-একটা ছেলে তার লিঙ্গকে অপবিত্রভাবে ব্যবহার করেও বেঁচে থাকবে,অার তুই একা পাপের দায় বহন করবি?তোর জম্ম,মৃত্যু,রুপ-লাবন্য কোন জিনিসে বিপ্লবের হাত রয়েছে বল? দীপ্তি খুব কড়া ভাষায় মনিকাকে জিজ্ঞেস করে।
তোর লাশ সামনে নিয়ে তোর মায়ের বুক ফাঁটা কান্নাটা একবার কল্পনা করতো,অাল্লাহর এত সুন্দর দেহটা কিছু ডাক্তার কেটে টুকরো টুকরো করছে,অাগামী কালকের সব পত্রিকায় লাল অক্ষরে লেখা অাসবে “প্রেমে ব্যর্থ হয়ে মনিকার অাত্বহত্যা” এই নোংরা স্মৃতিগুলো কল্পনা করে দেখতো?এসব কি তোকে মহান করবে??সতী-সাধবী নারী বলে সমাজে তোর নামে মাজার তৈরী হবে??দীপ্তি শাসনের সুরে মনিকাকে প্রশ্ন ছুঁড়ে।

মনিকা অঝরো কাঁদতে থাকে।সমস্ত পৃথীবি তার কাছে অন্ধকার লাগে।তবু দীপ্তির কথায় যেন তার সামনে টিমটিম করে আশার আলো উদয় হতে লাগলো।ঠিক তখন মসজিদ থেকে ভেসে অাসে “হাইয়্যা অালাল ফালাহ,”এসো, কল্যানের পথে এসো।

দীপ্তি মনিকার হাত ধরে বলে “চল,মাগরিবের নামাজ পড়ে অাল্লাহর কাছে প্রাণ খুলে ক্ষমা চেয়ে নে।তিনিই সর্বোৎকৃষ্ট বিচারক। সবাই তোকে নিয়ে বিরক্ত হলেও তিনি তোকে অবশ্যই ভালবাসবেন।কারন,তিনি অপরাধীর অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়াকে বডড ভালবাসেন।
অযু করে মনিকা নামাজে দাঁড়িয়ে পড়লো………… “ইহদিনাছ ছিরাতাল মোস্তাকিম”।

হে অাল্লাহ,অামাকে সহজ সরল পথ দেখাও। “গায়রিল মাগদুবি অালাইহিম”ঐ পথ নয় যে পথে গিয়েছে অভিশপ্তরা”।
মনিকা যেন হারতে হারতে আবার নিজেকে খুঁজে পেয়েছে।ঠিক যেন আল মাহমুদের সেই কবতিার বইয়ের ,মত “তোমাকে হারিয়ে কুঁড়িয়ে পেয়েছি “।মনিকা যেন তাকে আবার নতুন এক মসৃণ ও সুন্দর জীবনে আবিস্কার করলো। নামাজ শেষে দীপ্তির কোলে মাথা রেখে মনিকা বলল “এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তোর মত দীপ্তির বড়ই প্রয়োজন”।

(বি:দ্র:-নাম,ঠিকানা সম্পূর্ণ কাল্পনিক।দিকভ্রান্ত অামার বোনগুলোর অাত্বহত্যায় ব্যথিত হৃদয়ে লেখাটা লিখলাম।যদি একটি প্রাণও বেঁচে যায় সেই কামনা।

লেখক-
ইলিয়াছ হিমেল,
সমাজ কল্যাণ ও গবেষণা বিভাগ,
শিক্ষার্থী,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।