নিউজ ডেস্ক : বাংলাদেশ রপ্তানী প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভিত্তিপ্রস্তর ফলক উদ্বোধন করা হয়েছে। বুধবার (২৪ জানুয়ারী) সকাল সাড়ে ১১ টায় বঙ্গবন্ধু আর্ন্তজাতিক সম্মেলন কেন্দ্র থেকে ভিড়িও কনফারেন্সের মাধ্যমে ১ হাজার ১’শ ৫০ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত বেপজা মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের ফলক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বেপজা ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টরস্ সামিট-১৮ অনুষ্ঠানে বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মুহম্মদ হাবিবুর রহমান খান (এনডিসি, পিএসসি) এর সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাণিজ্য মন্ত্রী তোফয়েল আহমেদ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মিরসরাই থেকে ভিডিও কনফারেন্সে বক্তব্য রাখেন গৃহায়ন ও গনপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি এবং চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জিল্লুর রহমান।

বেপজা ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টরস্ সামিট-২০১৮ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বেসরকারিখাত দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি। এজন্যই আওয়ামী লীগ সরকার বেসরকারি খাতকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে বলে জানিয়েছেন তিনি। বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং পণ্যের বহুমুখীকরণের মাধ্যমে রফতানি বৃদ্ধি, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বেপজা দেশের ইপিজেডগুলোকে ইতোমধ্যে বিনিয়োগের আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে দেশ-বিদেশে সুপরিচিত করেছে। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের পাশাপাশি শিল্প-উৎপাদনের দিকে নজর দেন। তিনি পরিত্যক্ত কলকারখানাগুলো জাতীয়করণ করেন। বঙ্গবন্ধুর মাত্র সাড়ে তিন বছর রাষ্ট্র পরিচালনাকালে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার শতকরা ৭ ভাগের উপরে উঠেছিলো। কিন্তু জাতির পিতাকে হত্যার পর ৭৫-পরবর্তী সরকারগুলো সেসব কলকারখানা পানির দামে বিক্রি করে দেয়। তারা মানুষের উন্নয়নের পরিবর্তে নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নে ব্যস্ত ছিল।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৯৬ সালে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে আমরা বেসরকারি খাতের উন্নয়নে কাজ শুরু করি। দেশে বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য আমরাই প্রথম দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিয়ে বেপজা ইনভেস্টরস্ কনফারেন্স করেছিলাম। সে সময় দেশে চট্টগ্রাম ইপিজেড এবং স্বল্প পরিসরে ঢাকা ইপিজেড চালু ছিল। পরবর্তীকালে বিনিয়োগের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির জন্য আমরা ঢাকা ও চট্টগ্রাম ইপিজেডের সম্প্রসারণ করি এবং কুমিল্লা ইপিজেড স্থাপন করি। ২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বেপজার বিনিয়োগ দ্বিগুণের বেশি এবং রফতানি প্রায় আড়াই গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ৮টি ইপিজেড মাত্র ২ হাজার ৩০৭ দশমিক ২৭ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত। এই ৮টি ইপিজেডে মোট ৪৬৮টি শিল্প প্রতিষ্ঠান চালু রয়েছে। প্রায় ৫ লাখ বাংলাদেশি নাগরিকের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এদের মধ্যে শতকরা ৬৪ ভাগই নারী। বিগত নয় বছরে ইপিজেডগুলোতে ২ লাখ ৮৩ হাজার ৬২০ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। তিনি জানান, বেপজার অধীনে ইপিজেডগুলো দেশের মোট জাতীয় রপ্তানি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রায় ২০ শতাংশ অবদান রাখছে। সরকারের বিনিয়োগবান্ধব নীতি, সময়োপযোগী বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং আপনাদের প্রচেষ্টা এই প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক হয়েছে। বিনিয়োগবান্ধব নীতির ফলেই চীন, জাপান, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়াসহ ৩৮টি দেশের বিনিয়োগকারীরা ইপিজেডের কারখানায় বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড পণ্য উৎপাদন করছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘আমি জাতির পিতার কন্যা। আমি রাজনীতি করি দেশের কৃষক, শ্রমিক খেটে খাওয়া মানুষের জন্য। দেশের বিনিয়োগ, রপ্তানী ও কর্মসংস্থানে বেপজা বিগত সময়ে অভূতপূর্ব সাফল্য এনে দিয়েছে। ভিশন ২০২১ ও ২০৪১ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশের কৃষি জমি রক্ষা করে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে অকৃষি জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের কাজ করছে সরকার। সারা দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের কাজ দ্রুততার সহিত এগিয়ে চলছে। মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়িত হলে পুরো চট্টগ্রামের চেহারা পাল্টে যাবে। চট্টগ্রাম বন্দরের নিকটবর্তী হওয়া এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাছে হওয়ায় মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের গুরুত্ব অনেক। কৃষি জমি রক্ষা করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন করতে হবে। কৃষি জমিতে কাউকে শিল্প কারখানা করতে দেওয়া হবে না। কৃষি জমি রক্ষা করে অকৃষি জমিতে শিল্প কারখানা স্থাপনের মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন করতে হবে।’

গৃহায়ন ও গনপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, মিরসরাইয়ে ৩০ হাজার একর জমির উপর মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের কাজ চলতেছে। যেখানে ১৫ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হবে। মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। যা মিরসরাইয়ের চাহিদা পূরণ করে জাতীয় গ্রীডে সরবরাহ করা যাবে। আর বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৩৫০ টি শিল্প কারখানায় প্রায় ৫ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হবে। মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে মিরসরাইয়ের বেকার যুবকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ দেওয়ার জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর নিকট দাবী জানান। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যেমে অর্থনৈতিক অঞ্চলে চাকুরীর ক্ষেত্রে স্থানীয়দের অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা দেন।

মিরসরাই চরশরৎ এলাকায় অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মাঝে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. আব্দুল মান্নান, পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি এস এম মনিরুজ্জামান, চট্টগ্রাম পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী, চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এম খালেদ ইকবাল, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) চেয়ারম্যান আবদুচ সালাম, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আ’লীগের সভাপতি নুরুল আলম, সাধারণ সম্পাদক ও চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এমএ সালাম, আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (ঢাকা) ব্যারিষ্টার নওফেল আলম, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আ’লীগের যুগ্ম সম্পাদক জসিম উদ্দিন, উপজেলা চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) ইয়াছমিন আক্তার কাকলী, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ সাইফুল কবির, সহকারী কমিশনার (ভূমি) কায়সার খসরু, উপজেলা আ’লীগের সভাপতি শেখ আতাউর রহমান, সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী, বারইয়ারহাট পৌরসভার মেয়র নিজাম উদ্দিন, মিরসরাই পৌরসভার মেয়র গিয়াস উদ্দিনসহ বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সরকারী কর্মকর্তা ও স্থানীয় জনগণ।